মাধবপুর, (হবিগঞ্জ) ৪ এপ্রিল : স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেই বীর শহীদদের প্রাপ্য সম্মান বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার প্রদান করেনি। তিনি বলেন, তেলিয়াপাড়ার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আমাদের জাতীয় গর্বের অংশ হলেও দীর্ঘদিন তা উপেক্ষিত ছিল এবং স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস জনগণের সামনে তুলে ধরা হয়নি।
শনিবার (৪ এপ্রিল) দুপুরে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া চা বাগান স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া দিবস উপলক্ষে আয়োজিত মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ইউনিটের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন আহ্বায়ক গোলাম মোস্তফা রফিক।
প্রধান অতিথি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম এ জি ওসমানী ছিলেন সিলেটের কৃতি সন্তান। কিন্তু তাকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হয়নি। একইভাবে দেশের স্বাধীনতার জন্য যারা রক্ত দিয়েছেন, জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের অবদানকেও অনেক ক্ষেত্রে আড়াল করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিগত সরকার শুধুমাত্র শেখ মুজিবুর রহমান-এর নামকে সামনে এনে অন্য বীর সেনানায়ক ও মুক্তিযোদ্ধাদের ইতিহাস উপেক্ষা করেছে।
তিনি আরও বলেন, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাতে জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পর দেশব্যাপী মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয় এবং জনগণ ঝাঁপিয়ে পড়ে। এর ধারাবাহিকতায় ৪ এপ্রিল তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ম্যানেজার বাংলোয় মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম এ জি ওসমানীসহ বিভিন্ন সেক্টরের কমান্ডারদের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যা মুক্তিযুদ্ধের সামরিক কৌশল নির্ধারণে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখে।
সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন এমপি, হুইপ জিকে গউছ এমপি, হবিগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ মোঃ ফয়সল, ডা. শাখাওয়াত হোসেন জীবন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আমিনুল, মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় সংসদের আহ্বায়ক নঈম জাহাঙ্গীর ও সদস্য সচিব সাদেক আহম্মেদ খান।
প্রধান অতিথি আরও বলেন, একটি রাজনৈতিক দল সংস্কার নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৬ সালে খালেদা জিয়া ৩১ দফা কর্মসূচির মাধ্যমে ২০৩০ ভিশন ঘোষণা করেছিলেন, যার সঙ্গে বর্তমান সংস্কার প্রস্তাবের মিল রয়েছে। অথচ একটি পক্ষ বিএনপি সংস্কার চায় না—এমন অপপ্রচার চালিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। তিনি বলেন, “আমরা সংস্কার চাই এবং সেই সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।”
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, বিগত সরকার দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তেলিয়াপাড়া দিবসকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি। তিনি আশ্বাস দেন, বর্তমান সরকার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় তেলিয়াপাড়া দিবসকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেবে এবং এর স্মৃতি সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেন, তেলিয়াপাড়ার বৈঠক ছিল মুক্তিযুদ্ধের সামরিক কৌশল নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এখান থেকেই গেরিলা যুদ্ধের কৌশল সুসংগঠিত হয় এবং পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সফল প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দলীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা প্রকৃত ইতিহাসকে বিকৃত করেছে। “মুক্তিযুদ্ধ কোনো দলের নয়, এটি সমগ্র জাতির,”—যোগ করেন তিনি।
হুইপ জিকে গউছ বলেন, মুক্তিযুদ্ধ আমাদের আবেগ ও গৌরবের ইতিহাস। কিন্তু ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়াকে বিগত সময়ে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তিনি এই স্থানের উন্নয়ন ও সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
সংসদ সদস্য সৈয়দ মোঃ ফয়সল বলেন, তেলিয়াপাড়ার বৈঠকের সঙ্গে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা জড়িত। এই স্থান সংরক্ষণ করা হলে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারবে এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে।
সমাবেশে বক্তারা সর্বসম্মতিক্রমে তেলিয়াপাড়া দিবসকে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি প্রদান, স্মৃতিসৌধের উন্নয়ন এবং মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ ও প্রচারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সভায় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের আহবায়ক নাঈম জাহাঙ্গীর, সদস্য সচিব সাদেক আহমেদ খান, জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজ, পুলিশ সুপার মো: তারেক মাহমুদ সহ মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আরো বলেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস যারা বিকৃত করেছে, তারা আজ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে মুক্তিযুদ্ধে যাদের অবদান ছিল, তাদের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি; বরং মুক্তিযুদ্ধকে এক ব্যক্তি-কেন্দ্রিক করে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম এ জি ওসমানীকে যথাযথভাবে স্মরণ করা হয়নি। শহীদ জিয়াউর রহমানের ডাকে সারা দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বেগম খালেদা জিয়াকে তিনি প্রথম মহিলা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, আজ যখন তাঁর সুযোগ্য পুত্র দেশ পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন, তখন তিনি আমাদের মাঝে নেই। প্রধানমন্ত্রী চান এদেশে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ মূল্যায়ন হোক এবং মানুষ প্রকৃত ইতিহাস জানুক। একটি মহল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করতে চায় না, তবে আমরা জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করি।
শ্রমিকদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করছে; তাদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার কাজ করবে। প্রধানমন্ত্রী দেশের সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নির্মূল করার বিষয়ে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন। দলীয় কেউ যদি কোনো অপকর্মে জড়িত হয়, দল তার দায় নেবে না। তিনি বলেন, “দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো”—যারা অপকর্ম করবে, তাদের দলে রাখা হবে না।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Suprobhat Michigan

মাধবপুর, (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি :